আপনি জানেন কি ? একজন পুরুষের শরীরে দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন?

 একজন পুরুষের শরীরে দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন?  

একজন পুরুষের শরীরে দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন
একজন পুরুষের শরীরে দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন 


প্রতিদিন শরীরের কার্যক্রম চালাতে এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে একজন পুরুষের নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালরির প্রয়োজন। এই চাহিদা নির্ভর করে তার বয়স, ওজন, উচ্চতা, দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী। সঠিক ক্যালরির হিসাব জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতেও সহায়তা করে।  


ক্যালরির ভূমিকা 

ক্যালরি হলো শক্তির একটি একক, যা আমাদের খাবার থেকে পাওয়া যায়। শরীরের কার্যক্রম যেমন—শ্বাস নেওয়া, হৃদপিণ্ডের কাজ, মস্তিষ্কের কার্যক্রম, এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় এই শক্তি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম বা কাজকর্মে ক্যালরি খরচ হয়। যদি কেউ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করে, তবে সেই অতিরিক্ত ক্যালরি চর্বি হিসেবে জমা হয়, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, প্রয়োজনের তুলনায় কম ক্যালরি গ্রহণ করলে ওজন কমে এবং দুর্বলতা দেখা দেয়।  



দৈনিক ক্যালরি চাহিদা নির্ধারণ :

একজন পুরুষের দৈনিক ক্যালরি চাহিদা নির্ধারণের জন্য প্রথমে বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR) গণনা করতে হয়। BMR হলো শরীরের মৌলিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির পরিমাণ, যখন শরীর সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকে। এটি নির্ভর করে তিনটি উপাদানের ওপর—ওজন, উচ্চতা, এবং বয়স।  


BMR নির্ধারণের জন্য ফর্মুলা (Harris-Benedict Equation):

BMR = 88.362 + (13.397 \times ওজন\,(কেজি)) + (4.799 \times উচ্চতা\,(সেমি)) - (5.677 \times বয়স\,(বছর))

এরপর, দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তার মাত্রা অনুযায়ী মোট ক্যালরির চাহিদা (TDEE) নির্ধারণ করা হয়।  


শারীরিক সক্রিয়তার মাত্রা অনুযায়ী গুণক  

  • কম সক্রিয় (বেশিরভাগ সময় বসে থাকা): BMR × 1.2  
  • মাঝারি সক্রিয় (হালকা ব্যায়াম): BMR × 1.375  
  • সক্রিয় (মাঝারি ব্যায়াম): BMR × 1.55  
  • খুব সক্রিয় (ভারী ব্যায়াম): BMR × 1.725  
  • অত্যন্ত সক্রিয় (খুব ভারী কাজ): BMR × 1.9  


উদাহরণ: একজন ৭০ কেজি ওজনের পুরুষ  

উচ্চতা: ১৭৫ সেমি  

বয়স: ৩০ বছর  

সক্রিয়তার মাত্রা: মাঝারি  


প্রথমে BMR নির্ধারণ করা যাক:  

BMR = 88.362 + (13.397 \times ৭০) + (4.799 \times ১৭৫) - (5.677 \times ৩০)  

= ১৬৯৫.৬৭৭\, ক্যালরি  


মোট চাহিদা (TDEE):  

TDEE = ১৬৯৫.৬৭৭ \times 1.375 = ২৩২৯.৫\, ক্যালরি (প্রায়)




ব্যক্তিভেদে ক্যালরির পার্থক্য :

ক্যালরির চাহিদা একজন ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, স্বাস্থ্য এবং কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে।  

ওজন কমানোর জন্য: প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ক্যালরি থেকে ৫০০-৭০০ কম গ্রহণ করুন।  

ওজন বাড়ানোর জন্য: দৈনিক চাহিদার চেয়ে ৩০০-৫০০ ক্যালরি বেশি গ্রহণ করুন।  


সঠিক ক্যালরি গ্রহণের উপায় :

দৈনিক ক্যালরির চাহিদা পূরণে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, শর্করা, চর্বি এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার থাকা উচিত। প্রাকৃতিক খাবার যেমন—সবজি, ফল, শস্য, মাছ, মাংস ইত্যাদিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া ভালো।  

সঠিক ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীর সুস্থ থাকে, কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। তাই নিজের ক্যালরির চাহিদা সম্পর্কে জেনে সেই অনুযায়ী খাবার খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।  


কত ক্যালরিতে ১ কেজি ওজন বাড়ে?

ওজন বাড়ানো কিংবা কমানোর ক্ষেত্রে ক্যালরির গুরুত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত, ১ কেজি ওজন বাড়াতে ৭,৭০০ ক্যালরি অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হয়। এই হিসাব মূলত শারীরিক চর্বির ঘনত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত। ১ গ্রাম চর্বি থেকে প্রায় ৯ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। তবে, এটি শরীরের মেটাবলিজম, শারীরিক সক্রিয়তা এবং খাদ্যের গুণগত মান অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।


ক্যালরি ও ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক

ওজন বাড়ানোর জন্য শরীরে ক্যালরির উদ্বৃত্ত থাকতে হয়, অর্থাৎ আপনার দৈনিক চাহিদার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। যদি আপনার দৈনিক মোট ক্যালরি চাহিদা ২,৫০০ হয় এবং আপনি প্রতিদিন ৫০০ ক্যালরি বেশি গ্রহণ করেন, তাহলে ১৫ দিনে প্রায় ১ কেজি ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।


ক্যালরি বৃদ্ধির উপায়

১ কেজি ওজন বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত ৭,৭০০ ক্যালরি গ্রহণ করার জন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার যোগ করুন।


  1. প্রোটিন: মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, এবং ডাল।
  2. কার্বোহাইড্রেট: ভাত, রুটি, আলু, ও শস্যজাত খাবার।
  3. চর্বি: পনির, দুধ, মাখন, এবং বাদামের তেল।

ওজন বৃদ্ধিতে সতর্কতা:

ওজন বাড়াতে গিয়ে জাঙ্ক ফুড বা অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খেলে শরীরে চর্বি জমে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সঠিক পুষ্টির উৎস থেকে ক্যালরি গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।


ভাতের ক্যালরি উৎস?

ভাত মূলত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। এতে ৭০-৭৫% শর্করা, সামান্য প্রোটিন এবং খুব কম পরিমাণে চর্বি থাকে। এই কারণেই এটি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে ব্রাউন রাইস বা লাল ভাতের ক্ষেত্রে ক্যালরি সামান্য বেশি হলেও এতে ফাইবার এবং পুষ্টিগুণ বেশি থাকে, যা হজমে সহায়তা করে।


রান্নার পদ্ধতিতে পার্থক্য

রান্নার পদ্ধতির ওপর ভাতের ক্যালরি মান পরিবর্তিত হতে পারে।

সাদা সেদ্ধ ভাত: প্রতি ১০০ গ্রামে ১৩০-১৪০ ক্যালরি।

তেলের ভাত বা ফ্রাইড রাইস: অতিরিক্ত তেল এবং উপকরণের কারণে ২০০-২৫০ ক্যালরি (প্রতি ১০০ গ্রাম)।

পোলাও বা বিরিয়ানি: মসলা, ঘি, এবং তেল ব্যবহার করলে ক্যালরি মান অনেক বেড়ে যায়। ১ প্লেট পোলাও বা বিরিয়ানিতে গড়ে ৪৫০-৬০০ ক্যালরি থাকতে পারে।

ভাত খাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা

যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাদের জন্য ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।


সাদা ভাতের পরিবর্তে লাল ভাত বা ব্রাউন রাইস বেছে নিতে পারেন।

ভাতের সঙ্গে প্রচুর সবজি এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান, যা পুষ্টি সরবরাহের পাশাপাশি শরীরকে পূর্ণতা দেবে।


উপসংহার:

১ প্লেট ভাতে গড়ে ৩৫০ ক্যালরি থাকে, তবে এটি আপনার খাদ্যাভ্যাস এবং রান্নার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে ভাতের সঙ্গে সুষম খাবার গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

১ কেজি ওজন বাড়াতে হলে ধৈর্য ধরে এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্যের মাধ্যমে সঠিকভাবে ওজন বাড়ানো সম্ভব।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url